আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ডাচ ডেইরি ফার্মে উৎপাদিত হচ্ছে খাটি গরুর দুধ

464

মো. মাসুদ খান

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার সাতঘরিয়া গ্রাম। আধুনিকতা আর শিক্ষিতের ছোঁয়া অনেক আগে থেকে গ্রামটিতে লেগে আছে। সরকারের অনেক উচ্চ পদে যেমন এই গ্রামের লোকজন রয়েছে, তেমনি গ্রামটি ভরা রয়েছে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতি আর প্রবাসী লোকজন।
আর এই গ্রামটিতেই যাত্রা শুরু ‘ডাচ ডেইরি ফার্ম’ নামে একটি আধুনিক দুগ্ধজাত গরুর খামার। দেশের খ্যাতমান রপ্তানীমুখী গার্মেন্টস ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবা গ্রæপের সিস্টার প্রতিষ্ঠান এটি। সাতঘরিয়া গ্রামে ১০২ বিঘা জমির ওপর নির্মিত হয়েছে ডাচ ডেইরি লিমিটেড নামে একটি গরুর দুগ্ধ খামার। এখানে রয়েছে এক হাজারেরও বেশি দেশি-বিদেশি গরু। আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর এ খামারটি যাত্রা শুরু করে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে। দেশের বাজারে দুগ্ধ শিল্পের বিকাশ ও উন্নত পদ্ধতিতে ভালো মানের দুধ উৎপাদন এ খামারের উদ্দেশ্য। এখনই খামারে দুধ দেওয়ার মতো একটি গরু থেকে প্রতি বছরে (৩০৫ দিনে) প্রায় ৭ হাজার লিটার দুধ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে বৃহৎ আকারে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গরু পালন এটিই প্রথম। খামারে প্রবেশের জন্য দর্শনার্থী ও খামার সংশ্লিষ্টদের গায়ে জীবাণুনাশক কেমিক্যাল স্প্রে করে প্রবেশ করতে হয়। আর খামারে থাকা অধিকাংশ গরু অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান প্রজাতির। রয়েছে দেশি গরুও। এসব গরু পালন করা হয় কয়েকটি ধাপে। বিভিন্ন শেডে রাখা হয় বিভিন্ন ক্যাটাগরির গরু। এগুলোর জন্য উপযোগী ফ্যান, পায়ে যেন কোনো রোগ আক্রমণ না করে, এজন্য বিদেশ থেকে আনা হয়েছে আরামদায়ক কার্পেট। ভূমিষ্ট হবার পরে বাছুরকে রাখা হয় আলাদা প্লাটফর্মে। এছাড়া গর্ভবতী গরুদেরও রাখা হয় আলাদা জায়গায়।
প্রথমে এ খামারে অস্টেলিয়া ও ফ্রান্স থেকে খাবার নিয়ে আসা হতো। কিন্তু এখন খাবার দেশীয় পদ্ধতিতে খামারেই প্রস্তুত করা হয়। খামারে রয়েছেন দুইজন পশু চিকিৎসক। প্রতিদিন গরুর স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ নানা বিষয় দেখে থাকেন তারা।


জানা যায়, প্রযুক্তি নির্ভর এ খামারে অসুস্থ গরু চিহ্নিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। গরুর পুষ্টি চাহিদা প‚রণ হয়েছে কিনা তাও জানা যাবে। রয়েছে ‘মিলকিং পার্লার’। যেখানে মেশিনের মাধ্যমে একসঙ্গে ২৪টি গরুর দুধ দোহন করা যায়। যা বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম বলে জানা গেছে।
খামার সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে দুগ্ধ শিল্পের বিকাশ ঘটাতে ভ‚মিকা রাখবে এ খামারটি। দশ বছরের মধ্যে এটি এক অনন্য উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছাবে। খামার সংশ্লিষ্ট প্রতিদিনের সব তথ্য কম্পিউটারাইজড করা হচ্ছে। যদিও প্রাথমিক ধাপে বিদেশ থেকে গরু আনার ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়া যায়নি। তবে, এটি চালুর পর সংশ্লিষ্ট দপ্তর সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছে। ফার্ম চালুর প্রায় ৮ মাসের মাথায় ২০১৮ সালের মে মাসে গরু আনা হয়। প্রথমদিকে ফ্রান্স থেকে ঘাস আনা হতো। আর নেদারল্যান্ডস থেকে আনা হতো গরুর খাবার। কিন্তু এখন ফার্মেই খাবার প্রস্তুত করা হয়। এখানে তৈরি সাইলেজ এবং দানাদার খাবার খাওয়ানো হয়। খামারে দুধ দেওয়ার প্রতিটি উপযোগী গরু থেকে বছরে পাওয়া যায় প্রায় ৭ হাজার লিটার দুধ। খামারের সার্বিক বিষয় দেখভাল করেন গেøাব ডেইরি ফার্মস লিমিটেডের সদস্য ও ‘ডাচ ডেইরি ফার্ম’ এর পরিচালক মো. গিয়াস আহম্মদ। ১৮-১৯ বছর ধরে ডেইরি ফার্ম ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনি। ইংল্যান্ড ও আমেরিকা থেকে কৃষি বিভাগে পড়াশোনা শেষে নেদারল্যান্ডসে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন ডেইরি ফার্মের পরামর্শক ও সরকারি ফার্মের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি।


তিনি জানান, খামারে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় এক হাজারেরও বেশি গরু রয়েছে। খামারে গরুগুলোর জন্য আছে ‘কাও ম্যাট্রেস’। এটা দেখতে কার্পেটের মতো। এখানে গরু চলাফেরা করতে ব্যথা অনুভব করে না। ঘুমাতে সুবিধা হয়। পায়ে কোনো রোগব্যাধি দেখা দেয় না। ২৪টি গরু থেকে একসঙ্গে দুধ সংগ্রহ করা যায় আধুনিক মিলকিং পার্লারের মাধ্যমে। গরুদের বাসস্থানে বাতাস নিয়ন্ত্রণ করা হয়। গরুর শরীরে যেন ঠিকমতো বাতাস লাগে তাও নিয়ন্ত্রণ হয় আধুনিক ফ্যান দ্বারা। গরুর বাছুরের খাবার তালিকায় দুধ না রেখে পর্যাপ্ত ডেনকাভিট মিল্ক রিপ্লেসার খাওয়ানো হয়। এটি নেদারল্যান্ডস থেকে আনা হয়। বাছুরকে ১২ সপ্তাহ ধরে এ খাবারটি দেওয়া হয়। জন্মের পর থেকেই আলাদাভাবে রাখা হয় বাছুরকে। গরুর জন্য সার্বক্ষণিক পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হয়ে থাকে। খামারে সবমিলিয়ে ২ হাজার গরু পালনের পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।


তিনি আরও জানান, ২৪ কেজি ড্রাই ম্যাটার (সলিড খাবার) খাওয়ানো হয়। সলিড খাবার বলতে, যেসব খাবার দেওয়া হয় সেখান থেকে পানি সরিয়ে ফেলা হয়। যেমন- যে কোনো ঘাসে পানি থাকে ৭০-৮০ শতাংশ। এ খামারের গরুগুলো প্রচুর পরিমাণে ঘাস ও ৮০-৯০ লিটার পানি খেয়ে থাকে। গরুগুলো প্রতিবছর সাত হাজার লিটার দুধ দিয়ে থাকে। খামারে সফটওয়্যারের মাধ্যমে অসুস্থ গরু চিহ্নিত করার ব্যবস্থাও আছে।তিনি বলেন, বাংলাদেশে একটি ভুল ধারণা ছিল। এটা হলো- দেশে বিদেশি গরু বাঁচবে না। আমিই প্রথম এ ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণিত করেছি। বলতে গেলে সব গরুকে বাঁচিয়েছি। বিদেশ থেকে আনা এসব গরু থেকে বেশি পরিমাণে দুধ পাওয়া যায় না। এরকম একটা ধারণাও ছিল। এ ধারণাটিও পাল্টে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক ফার্মের পরামর্শক হিসেবে আছি আমি। বাংলাদেশে গরু পালন করে এমন বহু খামার আছে। কিন্তু কমার্শিয়াল ফার্ম বলতে যা বোঝায় এক্ষেত্রে আমাদেরটিই প্রথম। হাইব্রিড গরু কীভাবে লালন-পালন করতে হবে এ ব্যাপারে কারও অভিজ্ঞতা ছিল না। এখন আমরাই এ ব্যাপারটাতে চেষ্টা করে সাফল্য পেয়েছি। ধীরে ধীরে গরুর সংখ্যা বাড়াচ্ছি। এখানে ব্রিডিং ফার্ম করা হবে। ডাচ ডেইরি লিমিটেড এ ফার্মটির পরিচালক। এই ফার্মটি দেখে অনেকেই আসছেন পরামর্শ নেওয়ার জন্য। এটিই প্রথম খামার যেখানে বৃহৎ পরিসরে আধুুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

খামার স‚ত্রে জানা যায়, খামারে ফ্রিজিয়ান গরুগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৩০০ থেকে ১৪০০ লিটার দুধ সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। বর্তমানে দুধ দেওয়ার মতো উপযুক্ত গরু ফার্মে রয়েছে ৫৯টি।
প্রাথমিকভাবে বিদেশ থেকে আনা হয়েছিল ৬০টি গরু। এছাড়াও খামারে রয়েছে দেশীয় বিভিন্ন জাতের গরু। মিল্কভিটা, রস মিষ্টান্ন ভান্ডার, স্থানীয় ও ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খামার থেকে দুধ সংগ্রহ করে।
খামারে ১২২টি অস্ট্রেলিয়ান ও গরু ২৭৮টি ষাড় আছে, এছাড়া দেশী বিদেশি মিলিয়ে ২৯৬টি ছাগল, ভেড়া-৩৯০টি আছে।
ব্যাপকভাবে হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান গরু আনার ক্ষেত্রে দেশে এটিই প্রথম। খামারে দুই হাজার গরু আনার পরিকল্পনা আছে বলে জানা গেছে সংশ্লিষ্ট স‚ত্রে।
শুধু গরুই নয়। এখানে উন্নত মানের ষাঢ় গরুও পাওয়া যায় কোরবানির সময়। কোন প্রকার মোটা-তাজা করণের মত অসাধু কাজ হয়না এখানে। শুধু অনুনিক পদ্ধতিতে উন্নত মানের খাবার (ঘাস) দেয়া হয়। কোন প্রকার দর-দাম নয়, নির্দিষ্ট অংকের টাকার কেজি দরে বিক্র হয় ষাঢ় গরু। স্কল বা ওজন মাপার যন্ত্রে আস্ত ষাড়টিকে মেপে দেয়া হয়।