ফেরি চালকদের মাঝে ভয় ও চাপা ক্ষোভ

159

কাজী আরিফ

পদ্মায় ৬ দশমিক ২ নটিক্যাম মাইল বেগে বয়ে যাওয়া স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে ফেরি চালাতে হিমসিম খাচ্ছে ফেরি মাস্টাররা। স্রোতের প্রতিকুলে পদ্মা সেতুর নীচ দিয়ে পদ্মা পারি দিতে পারলেও অনুকুলে সেতুর নীচ দিয়ে যাবার সময় নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ফেরি চালকরা। এতে ধাক্কা খাচ্ছে পদ্মা সেতুর পিলারের সাথে। বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষ ভারী যানবাহন নিয়ে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। সরিয়ে নেয়া হয়েছে রো রো ফেরি। মাত্র ৩-৪টি ফেরি দিয়ে কোন মতে টিকিয়ে রাখা হয়েছে ফেরি সার্ভিস। এতে যাত্রী দুর্ভোগের পাশাপাশি পন্যবাহি ট্রাক রয়েছে পরাপারের অপেক্ষায়। অপরদিকে ফেরি দুর্ঘটনায় চালকদের সাময়িক বরখাস্তের ঘটনায় ফেরি স্টাফদের মাঝে এক ধরনের ভয় ও চাাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের দাবী স্রোতের সাথে ফেরি চালাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেতুর পিলারে ধাক্কা লাগছে। এতে আমাদের কি করার আছে। মরা কেন বরখাস্ত হবো?
শনিবার সরজমিনে শিমুলিয়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, রো রো ফেরি বন্ধ থাকায় কে টাইপের ৪টি ফেরি দিয়ে ছোট ও হালকা যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। তবে দক্ষিনবঙ্গমুখী গাড়ীর তেমন চাপ না থাকলেও ওপারে বাংলাবাজর ঘাট থেকে ঢাকামুখী গাড়ীর চাপ ছিল। ফেরির সংখ্যা কম থাকায় ও স্রোতের প্রতিকুলে চলতে গিয়ে সময় বেশী লাগায় যানবাহনগুলোকে ঘাটে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে য়েরির জন্য। শতাধিক ছোট গাড়ী পারাপারের অপেক্ষায় দেখা গেছে। তবে ঘাটে ৪০টির মত পন্যবাহি ভারী ট্রাক থাকলেও মহাসড়কের পাশে প্রায় শতাধিক পন্যবাটি ট্রাক পারাপারের অপেক্ষায় ছিল। এসব ট্রাক গত কয়েকদিন ধরে পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি এসকল ট্রাককে অন্য রুট ব্যবহার করতে বললেও তাদের ধারণা যে কোন সময় তাদের পার করা হতে পারে। তাছাড়া কয়েক দিন ঘাটে আটকা থেকে এদের সাথে থাকা টাকা-পয়সা ফুরিয়ে যাওয়ায় তারা আন্যরুট ব্যবহারের চিন্তা করতে পারছেনা।
ট্রাক চালক শামীম খান ঢাকা মেট্রো ড ১১-৭০৮৬ ট্রাকটি নিয়ে গত ৩ দিন আগে শিমুলিয়া ঘাটে এসেছেন। তার ট্রাকে খুলনা এয়ারপোর্টের মালামাল রয়েছে। পথ খরচের যে টাকা নিয়ে এসেছিলেন তাও শেষ হয়ে গেছে। অন্যরুট ব্যবহার কওে যেতে হলে তাকে বড় ধরণের লোকাসানে পড়তে হবে। তাই তিনি এখানেই অপেক্ষা করছেন যদি কোন মতে ফেরিতে ডাক পড়ে।
বরিশাল যাবার জন্য ট্রাক ড্রাইভা মো. খোকন মিয়া ঢাকা মেট্রো ন ১৪-০৪৯৪ ট্রাকটি নিয়ে গত ৪ দিন ধরে শিমুলিয়া ঘাটে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু কবে পদ্মা নদী পারি দিতে পাবেন তা তার জানা নেই। কিন্তু তার পরেও অপেক্ষা, কারণ অন্য রুট ব্যবহার করে গন্তব্যে যাবার মত টাকা তার হাতে নেই।
একই অবস্থা ট্রাক ড্রাইভার মো. রমজানের। ঢাকা মেট্রো অ ১১-০৩০৭ ট্রাকটি নিয়ে ৩ দিন আগে ঘাটে আসলেও গতকাল পর্যন্ত তিনি পার হতে পারেনি। বসে আছেন যদি পার হওয়া যায়। কারণ অন্য রুট ব্যবহার করে যে খরচ হবে তাতে লাভতো দূরের কথা নিজ থেকে ভর্তকি দিতে হবে। এদের মত এমন শতাধিক ট্রাক ড্রাইভার এখনও পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে ঘাট এলাকায়।
শুক্রবার নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকতা মো. জাহাঙ্গীর খান প্রেরিত এক বার্তায় অপেক্ষীয়মান ভারী জানবাহনকে অন্য রুট ব্যবহারের আহবান জানানো হয়েছে।
এদিতে শুক্রবার নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, পদ্মা সেতুর পিলারের সাথে ফেরির ধাক্কা লাগার ঘটনায় আমাদের কিছু নির্দেশনা ছিলো, এ ক্ষেত্রে আমরা উদাসিনতা লক্ষ করেছি।
একই দিন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বার বার পদ্মা সেতুতে আঘাতের ঘটনা চালকের অদক্ষতা ও নিছক কোন ঘটনা নয়। এর পিছনে কোন ষড়যন্ত্র আছে কিনা খতিয়ে দেখতে হবে। পদ্মা সেতুতে আঘাত মানেই সারাদেশের মানুষের অনুভুতিতে আঘাত। জাতীয় ভাবে মানুষ আহত হচ্ছে। অনুভুতিতে আঘাত লাগছে। কেন পদ্মা সেতুতে বার বার আঘাত লাগছে, কি কারণে-তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মন্ত্রী এমপিদের মত দেশের গুণিজনরা এ বিষয়টি নিয়ে ভাবনায় আছেন। তবে উদাসিনতা বা ষঢ়যন্ত্র যেটাই হউকনা কেন তা তদন্তের ব্যাপার। কিন্তু এ মুহুর্তে ফেরি চালক ও স্টাফদের মাঝে এক ধরণের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। গতকাল কয়েকজন ফেরি চালক ও স্টাফের সাথে কথা হলে তারা এমনটিই জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব চালকা ও স্টাফরা জানান, পদ্মায় যেহারে স্রোত বইছে, তাতে এমনিতেই ফেরিগুলো টেনে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এসময় ইঞ্জিনের গতিও তেমন কাজ করেনা। স্রোতের অনুকুলে চলতে গিয়ে পদ্মা সেতুর কাছে এসে ফেরির গতিকে ঠিক রাখা যায়না। তাই স্রোত ফেরিগুলোকে পিলারের কাছে টেনে নিয়ে যায়। ফলে ধাক্কা লাগে ফেরির সাথে। এতে আমাদের করার কিছু থাকেনা। কিন্তু দোষটা আমাদের ঘারে এসে পড়ছে। সাময়িক বরখাস্ত করা হচ্ছে আমাদের।
কিন্তু গত বছরও পদ্মা স্রোত ছিল, তখনতো এরকম ঘটনা ঘটেনি? এরকম প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, গত বছর এ সময় ফেরি চলাচল প্রায় বন্ধ ছিল। পলি পরে চ্যানেল ভরাট হয়ে যাওয়ায় ফেরি চলাচল বন্ধ রেখেছিল কর্তৃপক্ষ, তাই সে সময়ে দুর্ঘটনায় পড়তে হয়নি ফেরিগুলোকে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরিন নৌ পরিহন সংস্থা’র (বিআইডব্লিউটিস) চেয়ারম্যান সৈয়দ তাজুল ইসলাম গতকালও শিমুলিয়া ঘাটে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। তিনি কালের কন্ঠকে জানিয়েছেন, কোন মতেই ঘাট বন্ধ করা যাবেনা। আজ (শনিবার) স্রোত আরো বেড়েছে। ১৫ আগষ্ট উপলক্ষে ছোট গাড়ীর চাপ রয়েছে। বেগম সুফিয়া, বেগম রোকেয়া ও কুসুম কলি নামে আরো ৩টি মধ্যম আকৃতি ফেরি বহরে যোগ করা হয়েছে। অতি সাবধানতার সাথে ফেরিগুলো চলাচল করছে। তবে চালক ও স্টাফদের মাঝে ক্ষোভ থাকাটাই স্বাভাবিক। আমরা তাদের আশ^স্ত করেছি। ইনশাল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে ভারী যানবাহনকে অন্য রুট ব্যবহার করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।#